শিশু ও কিশোরদের মানসিক বিকাশের সময়টি সবচেয়ে সংবেদনশীল। এই বয়সে তারা যা দেখে, শোনে এবং অনুসরণ করে তা তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকটকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শিশুদের মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই অনুকরণপ্রবণ। টিকটকে জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতাদের আচরণ, ভাষা ও জীবনধারা তারা দ্রুত অনুসরণ করতে শুরু করে। কিন্তু এসব কনটেন্টের অনেকটাই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিশুদের মধ্যে অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি হয়—স্বল্প পরিশ্রমে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া বা সহজে অর্থ উপার্জনের ধারণা গড়ে ওঠে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল ভিডিও তাদের ধৈর্য কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে পড়াশোনা, বই পড়া বা সৃজনশীল কাজে আগ্রহ কমে যায়। আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো সাইবার ঝুঁকি। অনেক শিশু ব্যক্তিগত তথ্য বা ভিডিও প্রকাশের ঝুঁকি বুঝতে পারে না। অনলাইন হয়রানি, ট্রলিং বা নেতিবাচক মন্তব্য তাদের মানসিকভাবে আঘাত করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আত্মসম্মানবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিষণ্নতার লক্ষণও দেখা যায়।
সামাজিক এই যোগাযোগমাধ্যমটি ফ্রান্সের কিশোর ব্যবহারকারীদের মানসিকভাবে বিপজ্জনক অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিকটকের অ্যালগরিদম এমনভাবে কাজ করছে যে এটি কিশোরদের সামনে ক্রমাগত হতাশা, বিষণ্ণতা ও আত্মহনন–সম্পর্কিত কনটেন্ট তুলে ধরছে। যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিশু সুরক্ষা নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ১৩ বছর বয়সী শিশুদের অ্যাকাউন্টে মানসিকভাবে ক্ষতিকর ভিডিও ভেসে আসছে। অ্যামনেস্টি একে বলেছে, “মানসিক বিপর্যয়ের এক বিষাক্ত চক্র”।
অ্যামনেস্টির শিশু ও তরুণদের ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক গবেষক লিসা ডিটমার বলেন, আমাদের গবেষণা দেখায় টিকটক কত দ্রুতই না কিশোরদের বিপজ্জনক কনটেন্টের ঘূর্ণাবর্তে টেনে নিতে পারে। প্ল্যাটফর্মটির নকশা ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার পরিবর্তে মানসিক বিপর্যয় আরও বাড়ায়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, যখন ব্যবহারকারীরা দুঃখ বা হতাশাজনক ভিডিওর সঙ্গে বেশি ইন্টারঅ্যাক্ট করে, তখন অ্যালগরিদম একই ধরনের কনটেন্টের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে দেয়।
অ্যামনেস্টির মতে, এই কার্যপ্রণালি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (DSA)–এর স্পষ্ট লঙ্ঘন, যা শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ওপর কঠোর দায়িত্ব আরোপ করে। সংস্থাটি ইউরোপীয় কমিশনকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশে কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, শিশু বা কিশোররা ভাইরাল হওয়ার জন্য বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়েছে। এসব ঘটনা অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ডিজিটাল শিক্ষা না থাকলে তারা সহজেই ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্টের প্রভাবে পড়তে পারে। এ অবস্থায় অভিভাবকদের উচিত শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা, স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করা এবং তারা কী দেখছে তা নজরে রাখা।
নীতিনির্ধারকদের মতে, শিশুদের জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ তৈরি করতে কনটেন্ট মনিটরিং ও বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইতিবাচক ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরিতে উৎসাহ দিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি গঠনমূলক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, টিকটকে সচেতনতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের অভাবে এটি সমাজ, সংস্কৃতি এবং নতুন প্রজন্মের মানসিক বিকাশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করব, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?
