ঢাকা     ০১ মার্চ ২০২৬ ||  ১৭ ফাল্গুন ১৪৩২

Biz Tech 24 :: বিজ টেক ২৪

যেভাবে তরুণ প্রজন্মের জীবনধারায় প্রভাব ফেলছে টিকটক (পর্ব–১)

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪:০৯, ১ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ১৪:২১, ১ মার্চ ২০২৬

যেভাবে তরুণ প্রজন্মের জীবনধারায় প্রভাব ফেলছে টিকটক (পর্ব–১)

স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও কনটেন্টের কারণে টিকটক অল্প সময়েই কিশোর-তরুণদের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। শুরুতে এটি ছিল নাচ, গান কিংবা হাস্যরসাত্মক ভিডিও দেখার একটি বিনোদন প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যবহার শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি অনেকের দৈনন্দিন জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা এবং আচরণে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকটকের মূল শক্তি এর অ্যালগরিদম। ব্যবহারকারী কোন ভিডিও কতক্ষণ দেখছে, কী ধরনের কনটেন্টে লাইক বা কমেন্ট করছে—এসব বিশ্লেষণ করে অ্যাপটি একই ধরনের ভিডিও বারবার সামনে নিয়ে আসে। ফলে ব্যবহারকারী অজান্তেই দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে আটকে থাকে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই ‘অন্তহীন স্ক্রল’ পদ্ধতি মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন নির্ভর অভ্যাস তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে আসক্তির রূপ নেয়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের অভিযোগ, অনেক শিক্ষার্থী রাতে দীর্ঘ সময় টিকটক ব্যবহারের কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে। অনেকে ঘুমের সমস্যায় ভুগছে, আবার কেউ কেউ বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত শর্ট ভিডিও দেখার ফলে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়, যা শিক্ষাজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, ভাইরাল ভিডিও বানানোর জন্য কিশোররা ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট করছে—চলন্ত গাড়ির সামনে নাচ, বিপজ্জনক স্থানে ভিডিও ধারণ কিংবা জনসমাগমস্থলে অস্বাভাবিক আচরণ। এসব কর্মকাণ্ড অনেক সময় দুর্ঘটনা বা আইনি সমস্যার কারণ হয়েছে।

আরেকটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আত্মপরিচয় ও আত্মমূল্যায়নে। টিকটকে জনপ্রিয় হওয়ার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে লাইক, ভিউ এবং ফলোয়ার সংখ্যা। ফলে অনেক তরুণ নিজেদের মূল্যায়ন করছে ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে। প্রত্যাশিত সাড়া না পেলে হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। অভিভাবকদের একটি বড় উদ্বেগ হলো পরিবারে সময় কমে যাওয়া। আগে যেখানে অবসর সময় পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে কাটত, এখন অনেকেই একা বসে ভিডিও দেখছে। পারিবারিক যোগাযোগ কমে যাওয়ায় শিশুদের সামাজিক শেখার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করেছে টিকটক দ্রুতই কিশোরদের বিপজ্জনক কনটেন্টের ঘূর্ণাবর্তে টেনে নিতে পারে। প্ল্যাটফর্মটির নকশা ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার পরিবর্তে মানসিক বিপর্যয় আরও বাড়ায়। সংস্থাটির এক গবেষণায় দেখা যায়, যখন ব্যবহারকারীরা দুঃখ বা হতাশাজনক ভিডিওর সঙ্গে বেশি ইন্টারঅ্যাক্ট করে, তখন অ্যালগরিদম একই ধরনের কনটেন্টের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে দেয়। 

অ্যামনেস্টির মতে, এই কার্যপ্রণালি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (DSA)–এর স্পষ্ট লঙ্ঘন, যা শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ওপর কঠোর দায়িত্ব আরোপ করে। সংস্থাটি ইউরোপীয় কমিশনকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে ফরাসি কিশোর ও নিহত শিশুদের অভিভাবকদের অভিজ্ঞতাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৮ বছর বয়সী মায়েল বলেন, এখনও সেই ভিডিওগুলো মনে পড়ে— যেখানে মানুষ নিজেদের ক্ষতি করছে বা কোন ওষুধ খেতে হবে তা বলছে। এসব দেখে নিজের অজান্তেই মানসিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। আরেক অভিভাবক স্টেফানি মিস্ত্রে, যার ১৫ বছর বয়সী মেয়ে মারি ২০২১ সালে আত্মহত্যা করে। তিনি বলেন, টিকটক আমাদের সন্তানদের পণ্য বানিয়েছে। তাদের আবেগকে ব্যবহার করে অনলাইনে আটকে রাখে— এটা অগ্রহণযোগ্য।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সচেতনতা, সময় নির্ধারণ এবং বয়সভিত্তিক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই প্ল্যাটফর্ম তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।