বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ভারতের আদানি পাওয়ারকে বিদ্যুৎ কিনতে প্রতিবছর প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বেশি পরিশোধ করছে, যা প্রকৃত মূল্যের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের বরাতে ডেইলি স্টারের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা দেশের অন্যান্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির তুলনায় অনেক বেশি।
২০১৭ সালে প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ০.০৮৬১ ডলার, যা সমজাতীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি ইউনিট ০.১৪৯ ডলারে।
জাতীয় কমিটির হিসাব অনুযায়ী, আদানি চুক্তিটি নিকটতম বেসরকারি প্রতিযোগীর তুলনায় ৩৯.৭ শতাংশ বেশি ব্যয়বহুল এবং পুরনো সরকারি বিদ্যুৎচুক্তিগুলোর তুলনায় প্রায় ২.৭ গুণ বেশি খরচের।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মূল্যবৈষম্য কোনো পরিচালনাগত অদক্ষতার কারণে নয়; বরং জ্বালানি ব্যয়ের পূর্ণ পাস-থ্রু ব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার সূচকীকরণ এবং প্রত্যাশার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহের বিপরীতে স্থায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ আরোপের কারণেই ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
জাতীয় কমিটির সদস্য ও যুক্তরাজ্যের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক খান বলেন, এই চুক্তিতে এমন সব নথি পাওয়া গেছে যা যেকোনো আদালতে দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, “চুক্তিটির কাঠামোই প্রাথমিকভাবে দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনে দেখা যায়, এমন অনিয়মপূর্ণ চুক্তি সাধারণত দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়, কারণ কোনো বিচক্ষণ কর্মকর্তা বা রাজনীতিক স্বাভাবিকভাবে এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন না।”
মুশতাক খান আরও বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগের অন্তত ছয়জন কর্মকর্তা এই চুক্তি থেকে সরাসরি লাভবান হয়েছেন বলে কমিটি শনাক্ত করেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে আদানি পাওয়ার ও তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আদান–প্রদান হওয়া বিভিন্ন চিঠিপত্রের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তি বাতিল করা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন মুশতাক খান। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের এখনই এই আদানি চুক্তির বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, চুক্তিটি চ্যালেঞ্জ করা হলে স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং বাড়তে পারে। “দেশকে ২৫ বছরের বোঝা থেকে মুক্ত করতে ছয় মাস থেকে এক বছরের কষ্ট মেনে নেওয়ার জন্য জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের জন্যই মঙ্গলজনক হবে,” তিনি বলেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পটি উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই, কোনো পদ্ধতিগত তুলনামূলক বিশ্লেষণ বা স্বচ্ছ ‘ভ্যালু ফর মানি’ মূল্যায়ন ছাড়াই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয়।
২০১৫ সালে পিডিবি ও আদানি পাওয়ারের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের অনুমোদন দেওয়া হয়—একটি ভারতে এবং আরেকটি কক্সবাজারে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য। পরবর্তীতে কেবল ভারতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্যই চুক্তি কার্যকর হয়। তবে মহেশখালীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন না করার কারণ বা ভারতের ঝাড়খণ্ডে প্রকল্প স্থাপনের যৌক্তিকতা নিয়ে কোনো বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তখনই জানা ছিল যে, ভারতে অবস্থিত কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি শুধু বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, তবে সেটিকে আমদানি করা কয়লার ওপর নির্ভর করতে হবে। ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের তুলনায় ভারতে স্থাপনের কোনো ব্যয় সুবিধা থাকত না।
এর পাশাপাশি দীর্ঘ দূরত্বে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়েছে। ঝাড়খণ্ডে ব্যবহৃত কয়লার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করাও বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ কয়লাটি সরাসরি বাংলাদেশে আমদানি করা হয় না।
