রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ চালুর পর মাত্র চার দিনেই ২০০ থেকে ৩০০টি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মামলা শনাক্ত হয়েছে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিগন্যাল—শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি ও জাহাঙ্গীর গেট এলাকায় এআই প্রযুক্তিসম্পন্ন ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পাশাপাশি ফার্মগেটেও ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে অন্তত ৫০০টি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে এই প্রযুক্তি বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন এই ব্যবস্থায় ক্যামেরাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করতে সক্ষম। এর মধ্যে রয়েছে—লাল বাতি অমান্য, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, জেব্রা ক্রসিং দখল, সিটবেল্ট না বাঁধা, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, চালকের মোবাইল ব্যবহার, অতিরিক্ত যাত্রী বহন কিংবা অবৈধভাবে ভিআইপি লাইট ব্যবহার। শুধু তাই নয়, বিআরটিএর ডেটাবেইসের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যানবাহনের কাগজপত্রের বৈধতাও যাচাই করা হচ্ছে।
এআই ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ও ছবি ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এরপর সংশ্লিষ্ট যানবাহনের মালিক বা চালকের কাছে এসএমএস ও ডাকযোগে নোটিশ পাঠানো হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানা না দিলে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
ডিএমপি কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রযুক্তি চালুর ফলে ট্রাফিক সার্জেন্টদের ওপর চাপ কমবে এবং আইন প্রয়োগ আরও নিরপেক্ষ ও কার্যকর হবে। একজন ট্রাফিক কর্মকর্তা বলেন, আগে জনবল সংকট ও নানা প্রভাবের কারণে সবসময় আইন প্রয়োগ করা সম্ভব হতো না। এখন সরাসরি মালিকের কাছে নোটিশ পৌঁছাবে, ফলে দায় এড়ানোর সুযোগ কমবে।
বাস্তব ক্ষেত্রেও এর প্রাথমিক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। রাইড শেয়ারিং চালক ফারুক জানান, আগে ছোটখাটো নিয়ম ভাঙলে অনেকেই পার পেয়ে যেতেন কিন্তু এখন এআই ক্যামেরার কারণে চালকদের মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে এবং অনেকেই নিয়ম মেনে চলতে শুরু করেছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ সম্ভাবনাময় হলেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, শুধু প্রযুক্তি নয়, চালকদের আচরণ ও সড়কের সামগ্রিক শৃঙ্খলাও গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ যানবাহন, ডেটাবেইসের সীমাবদ্ধতা এবং একই নম্বরপ্লেট ব্যবহার—এসব সমস্যা সমাধান না হলে ভুল ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা যেতে পারে।
একইসঙ্গে পথচারীদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং ঢাকার জটিল ট্রাফিক পরিস্থিতিও এআই সিস্টেমের নির্ভুলতায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা। সব মিলিয়ে, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সঠিক বাস্তবায়ন ও ডেটাবেইস উন্নয়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ সফল হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং দুর্ঘটনা কমানো—দুটিই সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
