মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় তেল ও গ্যাস সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলে। এই পরিস্থিতি একদিকে বহু দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও, অন্যদিকে চীনের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এতে তেলনির্ভর অর্থনীতিগুলো চাপে পড়লেও বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে অনেক দেশ।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সৌরশক্তি, ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেশটি এখন বৈশ্বিক বাজারে নেতৃত্বের অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসেই চীন প্রায় ৬৮ গিগাওয়াট সৌর প্রযুক্তি রপ্তানি করেছে, যা আগের রেকর্ডের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
শুধু সৌর প্রযুক্তিই নয়, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির রপ্তানিতেও বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। গত বছরের তুলনায় এই তিন খাতে রপ্তানি প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। চীনে এই খাতগুলোকে ‘নব্য তিন’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মার্চ মাসে শুধুমাত্র ব্যাটারি রপ্তানি থেকেই দেশটি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষভাবে চীনের প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ ইতোমধ্যে সৌর প্যানেল আমদানি বাড়িয়েছে। এমনকি প্রায় ৫০টি দেশ চীনের সৌর প্রযুক্তি আমদানিতে নতুন রেকর্ড গড়েছে।
একইসঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারেও চীনের আধিপত্য বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরে বৈশ্বিকভাবে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত মার্চে চীনের বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দেশগুলোকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। অতীতে অনেক দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন তারা টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। এর ফলে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং ব্যাটারি প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের মতো বড় বাজারেও চীনের উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে।
এদিকে কিছু দেশ আগেভাগেই এই পরিবর্তনের সুবিধা নিতে শুরু করেছে। যেমন পাকিস্তান কয়েক বছর ধরে ব্যাপকভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমাতে সক্ষম হয়েছে। অন্যান্য দেশও এখন একই পথে হাঁটার পরিকল্পনা করছে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করলেও, একই সঙ্গে এটি জ্বালানি খাতে বড় ধরনের রূপান্তরের সূচনা করেছে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে চীন, যা ভবিষ্যতের জ্বালানি বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
