তুলনামূলক কম দামে সর্বশেষ মডেলের স্মার্টফোন পাওয়ার সুযোগে ক্রেতাদের একটি বড় অংশ ঝুঁকছেন অননুমোদিত গ্রে মার্কেটের ফোনের দিকে। ফলে একদিকে বৈধ আমদানিকারক ও দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। এসব অননুমোদিত ফোনের কারণে দিন দিন বাড়ছে ডিজিটাল প্রতারণার ঝুঁকি।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য ও সাম্প্রতিক শিল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব বলছে, দেশের হ্যান্ডসেট বাজারের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত গ্রে মার্কেটের দখলে চলে গেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে বিটিআরসি অবৈধ মোবাইল ফোনের বিক্রি, বিপণন ও বিতরণের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে অবৈধ হ্যান্ডসেটের বিরুদ্ধে অভিযান কার্যত বন্ধ ছিল। বিটিআরসি বলছে, দীর্ঘদিনের দুর্বল নজরদারির সুযোগে অবৈধ হ্যান্ডসেটের আমদানি ও বিক্রি বেড়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে বাংলাদেশের মোট হ্যান্ডসেট বাজারের মূল্য প্রায় ১৭০ কোটি ডলার এবং ২০২৫ সালে গ্রে মার্কেটের আকার ৭০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ বৈধ চ্যানেলের বাইরে থাকা ফোনের ব্যবসা এখন আর ছোটখাটো বাজার না, এটি দেশের মোবাইল ফোন অর্থনীতির একটি বড় অংশে পরিণত হয়েছে।
তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে গ্রে মার্কেটের বিস্তার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২২ সালে গ্রে ফোনের বাজার ২০ শতাংশের বেশি ছিল বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্যে পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে তা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে ওঠে এবং ২০২৫-২৬ সময়ে বিভিন্ন শিল্প হিসাব অনুযায়ী ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মোবাইল ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি) দাবি করেছিল, দেশের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের প্রায় ৬০ শতাংশই অবৈধ। সংগঠনটির হিসাবে, এসব ফোনের কারণে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একই খাতের আরেক হিসাব বলছে, গ্রে ও অবৈধ ফোনের কারণে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। হিসাবের পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণটা বেশ বড়। বিটিআরসি ২০২৫ সালের নভেম্বরে এনইআইআর চালুর আগে সরকারকে জানায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী অবৈধ মোবাইল ফোন আমদানিতে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার আইফোন সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ ৫০ হাজার বৈধভাবে আমদানি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্যামসাং-এর ক্ষেত্রেও অননুমোদিত ফোনের সংখ্যা বিপুল। বাংলাদেশে ব্যবহৃত প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ স্যামসাং ফোনের মধ্যে ১ কোটি ৪৯ লাখ কর পরিশোধ না করে বা অননুমোদিত চ্যানেলে দেশে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া কম দামের স্মার্টফোনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চীনা ব্যান্ড শাওমি অননুমোদিত চ্যানেলে দেশে আসছে।
গ্রে ফোনের চাহিদার মূল কারণ এর দাম। বৈধ ফোনের ওপর শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য করের বোঝা থাকায় একই মডেলের অফিসিয়াল ও গ্রে ফোনের দামে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে গ্রে ফোন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম দামে পাওয়া যায়। উচ্চমূল্যের ফোনে এই পার্থক্য আরও বেশি।
বাংলাদেশে অ্যাপোলের নিজস্ব অফিসিয়াল খুচরা নেটওয়ার্ক না থাকাও আইফোনের অনানুষ্ঠানিক বাজারকে শক্তিশালী করেছে। ২০২৫ সালে আইফোন ১৭ সিরিজ বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু না হলেও দেশের বড় বড় মোবাইল বাজারে সিরিজটির ফোন পাওয়া যাচ্ছিল। যার অধিকাংশই গ্রে আমদানি বা বিদেশফেরত যাত্রীদের মাধ্যমে এসেছে।
গ্রে মার্কেটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনে। বিটিআরসির হিসাবে ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশে হ্যান্ডসেট উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে ৪জি স্মার্টফোন উৎপাদন কমে ১৯ লাখ ১১ হাজার ইউনিটে দাঁড়ায়। শিল্পসংশ্লিষ্টরা গ্রে মার্কেটকে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম বড় বাধা হিসেবে দেখছেন।
এ বিষয়ে মোবাইল ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) সভাপতি জাকারিয়া শাহিদ বলেন, গ্রে মার্কেট আমাদের দেশীয় মোবাইল ফোন শিল্পের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা দেশে বিনিয়োগ করে কারখানা স্থাপন করছি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছি এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিপণ্য গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু অবৈধ পথে আমদানি করা মোবাইল ফোন শুল্ক ও কর ফাঁকি দিয়ে বাজারে আসায় বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে। এতে আমাদের উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে এবং গ্রাহকরাও অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ওয়ারেন্টি ও বিক্রয়োত্তর সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এমআইওবি দীর্ঘদিন ধরে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে। আমাদের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পক্ষে কাজ করা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অবৈধভাবে আমদানি করা, নকল এবং চুরি হওয়া হ্যান্ডসেট শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। আমরা মনে করি, শুধু অবৈধ ফোন বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; একই সঙ্গে বৈধ আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে হবে, করকাঠামোকে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে হবে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্টে দেশের স্মার্টফোন উৎপাদনও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ফিচার ফোন উৎপাদন কমেছে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রে ফোন শুধু সরকারের রাজস্ব কমাচ্ছে না, বৈধ ব্যবসা, স্থানীয় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকেও চাপে ফেলছে।
গ্রে মার্কেটের আরেকটি গুরুতর দিক হলো অপরাধ। এনইআইআর চালুর পর লাখ লাখ ক্লোন ও ভুয়া আইএমইআই শনাক্ত হয়েছে। বিটিআরসির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একই আইএমইআই নম্বর বিপুলসংখ্যক ফোনে ব্যবহার করা হয়েছে। একটি আইএমইআই নম্বরের সঙ্গে কয়েক কোটি সংযোগের তথ্যও পাওয়া গেছে।
২০২৪ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে দেশের ডিজিটাল জালিয়াতির ৭৩ শতাংশ অনিবন্ধিত ডিভাইসের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। আবার বিটিআরসি ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ই-কেওয়াইসি জালিয়াতির ৮৫ শতাংশ অবৈধ বা পুনঃপ্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে ঘটেছে। একই বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ নথিভুক্ত হয়।
অপরাধ তদন্তেও নিবন্ধনহীন বা ক্লোন আইএমইআই বড় সমস্যা তৈরি করে। একটি ফোনের আইএমইআই যদি একাধিক ডিভাইসে থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট ফোনটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়। চুরি হওয়া ফোন অন্য সিমে ব্যবহার করলেও একই সমস্যা তৈরি হয়। ফলে চোরাই ফোনের বাজার, প্রতারণা এবং ডিজিটাল অপরাধের সঙ্গে অননুমোদিত ডিভাইসের সম্পর্ক নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্বেগ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিটিআরসির এনইআইআরকে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী বছরের শুরুতে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী ১ জানুয়ারি থেকে এ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিটিআরসি। এবার এনইআইআরের সঙ্গে অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধের সুবিধাও রাখা হচ্ছে। সম্প্রতি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এনইআইআর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে তখন এই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এনইআইআর চালুর উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভের মুখে পড়েন সাবেক প্রধান উপদেষ্টার তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব। মোবাইল ব্যবসায়ীরা তখন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।
এ বিষয়ে এমআইওবি’র সভাপতি জাকারিয়া শাহিদ বলেন, গ্রে মার্কেটে অবৈধভাবে মোবাইল ফোন বিক্রির প্রভাব শুধু দেশীয় শিল্পের ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে ভোক্তা নিরাপত্তা এবং অপরাধঝুঁকির বিষয়টিও জড়িত। এসব ফোনের প্রকৃত উৎস ও মালিকানা যাচাই করা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে চোরাচালান, চুরি হওয়া হ্যান্ডসেটের অবৈধ কেনাবেচা এবং প্রতারণার মতো অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আমরা মনে করি, এ সমস্যা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কার্যকর নজরদারি, অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্তকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। একই সঙ্গে গ্রাহকদেরও অনুমোদিত বিক্রয়কেন্দ্র থেকে ফোন কেনা এবং ক্রয়ের রসিদ ও ওয়ারেন্টি সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
জানা গেছে, বিটিআরসি দুই ধাপে এনইআইআর চালু করবে। প্রথম ধাপ শুরু হবে আগামী ১ জানুয়ারি। এ ধাপে ব্যবস্থাটির মূল নকশায় থাকা প্রায় সব সুবিধা চালু থাকবে। তবে হ্যান্ডসেটের মালিকানা পরিবর্তন বা ডি-রেজিস্ট্রেশনের সুবিধা থাকবে না। আর দ্বিতীয় ধাপে ডি-রেজিস্ট্রেশন সুবিধাটি চালু করা হবে। তবে শুধু অবৈধ ফোন বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। উচ্চ করের কারণে অফিসিয়াল ফোনের দাম যদি গ্রে ফোনের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি থাকে, তাহলে বাজারে অননুমোদিত ফোনের চাহিদা থেকেই যাবে। তাই কর কাঠামো যৌক্তিক করাসহ কঠোরভাবে অবৈধ আমদানি বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
