ঢাকা     ৩০ জুলাই ২০২৬ ||  ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

Biz Tech 24 :: বিজ টেক ২৪

এআই যুগে কোন চাকরিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

বিজটেক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৬:৪১, ২৮ জুলাই ২০২৬

এআই যুগে কোন চাকরিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

যে শিল্প বিপ্লব মানুষের হাতে থাকা কাজ মেশিনের কাছে তুলে দিয়েছিল এখন সেই ইতিহাস যেন নতুন রূপে ফিরে এসেছে। পার্থক্য শুধু একটাই, এবার মেশিন শুধু শারীরিক শ্রম নয় মানুষের চিন্তা, বিশ্লেষণ, লেখা, নকশা, এমনকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজেও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। বর্তমানের কর্মবাজারকে বদলে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যাংক, গণমাধ্যম, কল সেন্টার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আইন, বিপণন—প্রায় প্রতিটি খাতে এআই ব্যবহারের ফলে কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে।

দেশের তরুণদের বড় একটি অংশ এখনো প্রচলিত দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। অথচ বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে নতুন দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। যদিও এআই চাকরি পুরোপুরি শেষ করবে না, তবে যারা প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।

কোন চাকরিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুনরাবৃত্তিমূলক ও নিয়মভিত্তিক কাজগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ডেটা এন্ট্রি, কল সেন্টার ও কাস্টমার সার্ভিস প্রতিনিধি, ব্যাংকের ব্যাক-অফিস কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষণে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ, সাধারণ অনুবাদক, সাধারণ কনটেন্ট রাইটার, বেসিক গ্রাফিক ডিজাইন, ট্রাভেল বুকিং এজেন্ট, প্রশাসনিক সহকারী ও প্রাথমিক পর্যায়ের আইনি ডকুমেন্ট প্রস্তুতকারীরা।

আগে যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে ২০-২৫ জন কর্মী প্রয়োজন হতো, এখন একই কাজ এআইভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে অর্ধেক জনবল দিয়েই করা সম্ভব হচ্ছে। বিশ্বের অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে নিয়োগ কমিয়েছে কিংবা নতুন নিয়োগ স্থগিত করেছে।

বাংলাদেশের জন্য কোথায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি?
দেশের অর্থনীতির বড় শক্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বের হচ্ছেন। কিন্তু তাদের বড় অংশ এখনো এমন দক্ষতা অর্জন করছেন, যা কয়েক বছরের মধ্যেই আংশিক বা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে বিশেষ করে ঝুঁকিতে রয়েছে—বিপিও (BPO) খাত, কল সেন্টার, ডেটা প্রসেসিং, সাধারণ ফ্রিল্যান্সিং, বেসিক ওয়েব কনটেন্ট লেখা ও সাধারণ ডিজাইন সার্ভিস। এমনকি সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে ফাইল ব্যবস্থাপনা, রিপোর্ট তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, ই-মেইল লেখা, উপস্থাপনা তৈরি—এসব কাজেও এআই দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে।

আবার নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে। এআই শুধু চাকরি কমাচ্ছে এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। এটি নতুন ধরনের কর্মসংস্থানেরও জন্ম দিচ্ছে। বর্তমানে যেসব দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে তার মধ্যে রয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকৌশলী, মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ, ডেটা অ্যানালাইসিস, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, ক্লাউড কম্পিউটিং বিশেষজ্ঞ, প্রম্পট প্রকৌশলী, এআই পণ্য ব্যবস্থাপক, রোবোটিক্স প্রকৌশলী, এআই প্রশিক্ষক, ডেটা বিশ্লেষক, সফটওয়্যার ডেভেলপারও অটোমেশন বিশেষজ্ঞ।

এছাড়া যেসব পেশায় মানুষের সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা এবং আবেগ বোঝার ক্ষমতা প্রয়োজন, সেসব খাতে এআই মানুষের বিকল্প হতে পারছে না।

কোন দক্ষতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি?
বিশেষজ্ঞদের মতে আগামী দশকের কর্মবাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে "এআই ব্যবহার করার দক্ষতা"। অর্থাৎ শুধু চ্যাটজিপিটি ব্যবহার জানলেই হবে না। জানতে হবে—

কীভাবে এআই দিয়ে গবেষণা করতে হয়, কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে সঠিক নির্দেশনা (Prompt) লিখতে হয়, কীভাবে এআইয়ের তৈরি কনটেন্ট সম্পাদনা করতে হয় এবং কীভাবে বিভিন্ন সফটওয়্যার একসঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। এর পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, প্রোগ্রামিং, ডেটা অ্যানালাইসিস, ডিজিটাল মার্কেটিং, ভিডিও এডিটিং, বিজনেস অ্যানালাইসিসও সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে দক্ষতার চাহিদা বাড়বে। 

বাংলাদেশের তরুণরা কতটা প্রস্তুত?
দেশে প্রযুক্তি বিষয়ে আগ্রহ বাড়লেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক এআই, ডেটা সায়েন্স কিংবা মেশিন লার্নিংয়ের পূর্ণাঙ্গ কোর্স নেই। আবার শিল্পখাতের প্রয়োজনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমেরও বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী এখনো শুধু সার্টিফিকেট অর্জনের দিকে বেশি মনোযোগ দেন। কিন্তু বর্তমান চাকরির বাজারে নিয়োগদাতারা সনদের চেয়ে দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতেও পরিবর্তন আসছে। আগে সাধারণ ডেটা এন্ট্রি বা কনটেন্ট রাইটিংয়ে সহজে কাজ পাওয়া গেলেও এখন আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টরা এআই-সহায়ক দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী পাঁচ বছরে চাকরির বাজারে টিকে থাকতে তরুণদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত—প্রথমত, ইংরেজিতে সাবলীল যোগাযোগ। এরপরই এআই টুল ব্যবহার শেখা। ডেটা বিশ্লেষণ ও এক্সেল, পাওয়ার বিআই কিংবা পাইথনের মতো সফটওয়্যার ব্যবহার। সমস্যা সমাধান ও সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষমতা। যোগাযোগ ও দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে নিয়মিত নিজেকে আপডেট রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো এআই ব্যবহারে পিছিয়ে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি কিনলেও কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে না। ভবিষ্যতে সবচেয়ে সফল প্রতিষ্ঠান হবে তারা, যারা কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিবর্তে কর্মীদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দিয়ে এআইয়ের সঙ্গে কাজ করার উপযোগী করে তুলবে।

ইতিহাস বলে প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব কিছু চাকরি কমিয়েছে, আবার নতুন চাকরিও তৈরি করেছে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। তবে এবার পরিবর্তনের গতি অনেক বেশি। ফলে প্রস্তুতির সময়ও কম। যারা নতুন প্রযুক্তি শেখার মানসিকতা রাখবেন, নিজেদের দক্ষতা নিয়মিত উন্নত করবেন এবং সৃজনশীল চিন্তাকে কাজে লাগাতে পারবেন তাদের জন্য সুযোগ কমবে না—বরং বাড়বে।

বাংলাদেশের প্রায় ৪ কোটির বেশি তরুণ-তরুণী আগামী কয়েক দশকের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এই বিশাল জনশক্তিকে যদি সময়োপযোগী প্রযুক্তি, এআই, ডেটা ও ডিজিটাল দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা যায় তাহলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা হয়ে উঠতে পারে। আর যদি পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রচলিত দক্ষতার ওপরই নির্ভর করা হয় তবে বৈশ্বিক কর্মবাজারে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।