ঢাকা     ০৮ নভেম্বর ২০২৬ ||  ২৪ কার্তিক ১৪৩৩

Biz Tech 24 :: বিজ টেক ২৪

প্রত্যেক বাংলাদেশির মাথাপিছু ঋণ ৬৪৬ ডলার: বিশ্বব্যাংক

প্রকাশিত: ১৭:১১, ৮ নভেম্বর ২০২৬

প্রত্যেক বাংলাদেশির মাথাপিছু ঋণ ৬৪৬ ডলার: বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৪৪ কোটি ডলার। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের ১৭ কোটি ৫৭ লাখ মানুষের মধ্যে এই ঋণ ভাগ করলে মাথাপিছু দাঁড়ায় প্রায় ৬৪৬ ডলার। এক বছরে দেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। গত এক দশকে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ উঠে এসেছে এ চিত্র।

গত ৫ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ছিল ৩৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের শেষে তা বেড়ে ১১৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। 

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে সরকারি ও সরকারের নিশ্চয়তা দেওয়া ঋণ ৮৯ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি খাতের নিশ্চয়তাবিহীন ঋণ ৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মোট ঋণের সবচেয়ে বড় অংশের দায় সরকারি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

সরকারি ও সরকারের নিশ্চয়তা দেওয়া ঋণের মধ্যে বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছে পাওনা ৫১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের কাছে ঋণ ৩২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া বেসরকারি ঋণদাতাদের কাছে রয়েছে ৫ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। বহুপক্ষীয় ঋণদাতাদের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) কাছে বাংলাদেশের ঋণ ২২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে ১৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। অন্য বহুপক্ষীয় সংস্থার কাছে ঋণ ১০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার।

দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওনা জাপানের। দেশটির কাছে বাংলাদেশের ঋণ ১২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। এরপর রাশিয়ার কাছে ৯ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতার কাছে ১০ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। ঋণের পরিমাণ বাড়লেও কিছু সূচকে স্বস্তির চিত্র রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ রপ্তানি আয়ের ২১০ শতাংশের সমান ছিল। ২০১৫ সালের তুলনায় এ অনুপাত বেড়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) তুলনায় বৈদেশিক ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশ, যা এক দশক আগের তুলনায় ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে, রপ্তানি আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের অনুপাত ২০১৫ সালের তুলনায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১৬ শতাংশ হয়েছে। মোট জাতীয় আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের অনুপাতও কমে ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে অনুপাত কমার অর্থ এই নয় যে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ পুরোপুরি কমে গেছে। 

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেশি। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ছয়টি দেশের এই অঞ্চলে মাথাপিছু গড় বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৫৬৪ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ৬৪৬ ডলার। ভারতের মাথাপিছু ঋণ প্রায় ৫২২ ডলার এবং নেপালের ৪০১ ডলার। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় এই পরিমাণ ২ হাজার ৬৪৫ ডলার, ভুটানে ৪ হাজার ২১৮ ডলার এবং মালদ্বীপে প্রায় ৮ হাজার ৯৫৭ ডলার। 

এদিকে বিশ্বজুড়েও বৈদেশিক ঋণের চাপ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মোট বৈদেশিক ঋণ ২০২৫ সালে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এসব দেশ ওই বছর মূলধন ও সুদ বাবদ মোট ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। টানা পাঁচ বছর ধরে তাদের ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ ও উন্নয়ন তথ্য বিভাগের পরিচালক হাইশান ফু বলেছেন, বেসরকারি ঋণদাতাদের কাছ থেকে অর্থায়ন বেশি হওয়া ইতিবাচক হলেও অনেক দেশ বেশি ঋণ নিচ্ছে এবং বেশি অর্থ পরিশোধ করছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে এবং সেই বিনিয়োগ থেকে কতটা আয় ও উৎপাদন বাড়ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণের অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে তা ভবিষ্যতে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রত্যাশিত আয় না এলে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে। ফলে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, প্রকল্পের কার্যকারিতা যাচাই এবং রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।